
খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলা আইনজীবী সমিতির প্রবীণ সদস্য, ক্রমিক ১ নম্বরভুক্ত জনাব জি. এ. সবুর ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর তারিখে তাঁর বর্ণাঢ্য পেশাজীবনের ৫০ বছর পূর্ণ করেছেন। পেশাগত জীবনের এই অসাধারণ মাইলফলকে পৌঁছানো একজন আইনজীবীর জন্য যেমন গর্বের, তেমনি সমাজের জন্যও এক অনন্য প্রাপ্তি। আমি নিজেও সৌভাগ্যবান ।
ভূমিকা
এই বিশাল মহাবিশ্বে কোটি কোটি নক্ষত্র-গ্রহের মাঝে একটি ছোট্ট গ্রহ পৃথিবী। তার মধ্যেও অসংখ্য প্রাণীর মধ্যে আমরা মানুষ, আর মানুষদের মধ্যে আইনজীবী—একটি ক্ষুদ্র অথচ গৌরবময় অংশ। পৃথিবীর ৮০০ কোটিরও অধিক মানুষের ভিড়ে আমাদের পেশা যেন স্রোতের বিপরীতে ন্যায়বিচারের শিখা জ্বালিয়ে রাখা এক কঠিন সাধনা। এই পেশার প্রতি একটি আয়াত স্মরণ করা যেতে পারে—
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করো, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সাক্ষ্য দাও, তা হোক নিজের বিপক্ষে, কিংবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিপক্ষে।”
—সূরা নিসা, আয়াত ১৩৫
এই দায়িত্ব কেউ কেউ কেবল পেশা হিসেবে নয়, জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। জনাব জি. এ. সবুর তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব।
মানবজীবনের তাৎপর্য ও পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি
আমরা যারা অল্প সময়ের জন্য পৃথিবীতে আসি, তারা জানি একদিন চলে যেতে হবে। কিন্তু যাওয়ার আগে কেউ কেউ রেখে যান স্থায়ী প্রভাব, প্রেরণা, ইতিহাস। শত ব্যস্ততা ও জটিলতার মাঝেও কিছু মানুষ ন্যায়ের পক্ষে অবিচল, সত্যের জন্য আপোষহীন। জনাব জি. এ. সবুর তেমনই একজন জীবন্ত ইতিহাস, যাঁর সততা, দায়বদ্ধতা, নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা, সমাজসেবার মানসিকতা এবং নেতৃত্বগুণ তাঁকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
সংক্ষিপ্ত জীবনী ও কৃতিত্ব প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা:
১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান সেকেন্ডারি বোর্ড, ঢাকা থেকে মেট্রিক পাস করে দৌলতপুর ব্রজলাল কলেজে অধ্যয়ন করেন। ছাত্রজীবনেই রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন।
স্বাধীনতা-পূর্ব রাজনীতি ও দেশপ্রেম:
হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এম. এ. গফুর ও মমিনউদ্দীন আহমদের নির্বাচনী প্রচারণা, ২৩ মার্চ ১৯৭১ পাইকগাছায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন, মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে গমনসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখেন।
আইন পেশায় প্রবেশ ও অবদান:
১৯৭৩ সালের ৩১ জানুয়ারি খুলনা আইনজীবী সমিতিতে যোগ দেন। ১৯৮২ সালে বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণের পর নিজ এলাকায় বিচার সেবার উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখেন। সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে ৩ তলা সমিতি ভবন নির্মাণে নেতৃত্ব দেন।
রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব:
বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করেন। ছিলেন পাইকগাছা রিলিফ কমিটির চেয়ারম্যান, থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সদস্য, বনানী সংঘের সম্পাদক, বাজার কমিটির সভাপতি।
আইনজীবী সমাজের জন্য অর্জন:
বার কাউন্সিল কর্তৃক সমিতিকে এফিলিয়েশন প্রদান প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখেন, গ্রাম্য আদালত প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেন, সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত লড়াই করে মধুমিতা পার্ক রক্ষা করেন।
চরিত্র ও চিন্তাধারা:
সততা, মানবিকতা ও জ্ঞানগম্ভীরতায় তিনি একজন রুচিশীল মানুষ, লেখক এবং গবেষক। “স্মৃতির পাতা থেকে” গ্রন্থের রচয়িতা তিনি।
উপসংহার
জনাব জি. এ. সবুর আইন পেশার সুবর্ণজয়ন্তীতে নিঃসন্দেহে একজন সৌভাগ্যবান এবং গর্বিত ব্যক্তি। তাঁর সততা, বুদ্ধিমত্তা, নেতৃত্বগুণ, এবং সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের কারণে তিনি শুধু একজন আইনজীবী নন, বরং একজন পথপ্রদর্শক। পাইকগাছা আইনজীবী সমিতি তাঁকে গর্বভরে স্মরণ করবে।
আমি তাঁর দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও সুখ-সমৃদ্ধি কামনা করি।
এই লেখা তাঁকেই উৎসর্গ করলাম। পাঠকের প্রশংসা থাকলে তাঁর জন্য, ত্রুটি থাকলে লেখকের।